সিলেট বিমানবন্দর সড়কের মালনিছড়া চা বাগান এলাকায় প্রাইভেট কার ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১জন নিহত ও ৫জন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) সকাল ৭টার দিকে এ ঘটনাটি ঘটে।
এসময় স্থানীয়রা গুরুতর আহতবস্থায় কারের যাত্রী মাহফুজ মিয়া (২২) নামের এক যুবককে উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
নিহত মাহফুজ মিয়া সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার পেছি শেওরা গ্রামের বকুল মিয়ার ছেলে। পরে পুলিশ নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
পুলিশ সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করে জানায়, প্রাইভেট কারটি যাত্রীদের নিয়ে সিলেট বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিলো। অপরদিকে ট্রাকটি সিলেট নগরীরর দিকে আসার পথে মালনিছড়া চা বাগান এলাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে কারটি দুমড়ে মুচড়ে যায়। সড়কে ছিটকে পড়েন যাত্রীরা।
সিলেটে ভোরের শান্ত পরিবেশ হঠাৎ করেই বিষণ্ন হয়ে ওঠে একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। জেলার একটি ব্যস্ত আঞ্চলিক সড়কে কার–ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই এক ব্যক্তি প্রাণ হারান এবং আরও পাঁচজন আহত হন। স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে আশপাশের মানুষ প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির সামনের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং যাত্রীরা আটকে পড়েন।
দুর্ঘটনাস্থলটি ছিল সিলেট শহর থেকে তুলনামূলক নিকটবর্তী একটি জনবহুল এলাকা, যেখানে সকাল থেকেই যানচলাচল শুরু হয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ একটি জোরালো শব্দ শোনা যায়, যেন কোনো ভারি বস্তু ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়রা ছুটে এসে দেখতে পান রাস্তার মাঝখানে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বিপরীত পাশে একটি মালবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে অস্বাভাবিক অবস্থায়। গাড়ির সামনের অংশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যাত্রীরা বের হওয়ার উপায় পাচ্ছিলেন না। সঙ্গে সঙ্গেই তারা উদ্ধারকাজ শুরু করেন।
খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে আটকে পড়াদের বের করে আনেন এবং দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা জানান, একজনকে হাসপাতালে আনার আগেই মৃত ঘোষণা করা হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, যদিও তারা চিকিৎসাধীন আছেন।
দুর্ঘটনার সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, হয়তো কোনো এক পক্ষের গতি নিয়ন্ত্রণ হারানো বা রাস্তার অবস্থার কারণে সংঘর্ষ ঘটেছে। সড়কের ওই অংশে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারকাজ চলছে, যার ফলে কিছু জায়গায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। কিছু চালক জানান, ওই সড়কে রাত বা ভোরবেলায় দৃশ্যমানতা কম থাকে, বিশেষ করে যখন কুয়াশা পড়ে বা পর্যাপ্ত স্ট্রিটলাইট থাকে না। এর সঙ্গে অতিরিক্ত গতি যুক্ত হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে।
ট্রাকচালককে উদ্ধার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িটি হঠাৎ তার লেনে ঢুকে পড়ে। অন্যদিকে গাড়িতে থাকা আহতরা বলছেন, তারা নিয়ম মেনে চলছিলেন এবং হঠাৎ সামনে ট্রাকটি খুব কাছে চলে আসে। দুটি পক্ষের বক্তব্য নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তদন্ত করছে।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা আবারও সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বহুদিন ধরেই তারা এই সড়কে অতিরিক্ত গতি, রাস্তার ভাঙাচোরা অংশ, এবং সঠিক সিগন্যালিং না থাকার কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ করে আসছেন। সম্প্রতি একই সড়কে কয়েকটি ছোট–বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে যা নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে প্রশাসনকে।
নিহত ব্যক্তির মৃত্যুসংবাদ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের সদস্যরা শোকে ভেঙে পড়েছেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। আহতদের পরিবার জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানিয়েছেন। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে দুজনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে এবং প্রয়োজনে সড়কের নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি চালকদের গতি নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুর্ঘটনাস্থলে শোকে নীরবতা নেমে আসে, যখন স্থানীয়রা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। অনেকেই বলেন যে সড়কে সতর্কতা ও আইন মানলে অনেক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব। আবার কেউ কেউ বলেন, শুধু চালকদের দোষ নয়—দুর্বল রাস্তা, অপর্যাপ্ত আলো, এবং এলোমেলো যানচলাচলও এই ধরনের দুর্ঘটনার জন্য সমানভাবে দায়ী।
সিলেট অঞ্চলের মানুষ প্রতিদিন বিভিন্ন কাজে শহরে যাতায়াত করেন, ফলে নিরাপদ সড়ক তাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল যে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং তা কমাতে প্রয়োজনে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।
দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত সুস্থতার জন্য অনেকে দোয়া করছেন। নিহত ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবার যে শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। স্থানীয়রা পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন।
এই ঘটনাটি দেশের চলমান সড়ক নিরাপত্তা সমস্যার আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ, চালকদের সচেতনতা, এবং সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।


