Collected from: somoynews.tv

স্থায়ী কারিকুলাম না থাকায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। ভুক্তভোগীরা বলছেন, অদূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে বারবার জিম্মি হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। তাই দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করা জরুরি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, একটি যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের কাজ চলছে।

কখনো সৃজনশীল, কখনো অভিজ্ঞতাভিত্তিক, আবার কখনো মূল্যায়নের নতুন ধারা-বারবার বদলে যায় শিক্ষাক্রম। আওয়ামী লীগের গত ১৬ বছরের শাসনামলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেন শিক্ষাব্যবস্থার ‘গিনিপিগ’-এ পরিণত হয়।

প্রায় প্রতি বছরই কারিকুলাম পরিবর্তন হয়েছে। ফলে পাঠ্যবইয়ের ভেতরে-বাইরে হিসাব মেলেনি। এতে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের শিখন-ঘাটতি। শিক্ষার্থীরা বলছেন, একটা কারিকুলামের সঙ্গে যখন আমরা মানিয়ে নিতে যাচ্ছি, তখনই নতুন সিদ্ধান্ত বা নতুন সিস্টেম চলে এসেছে। ফলে বারবার অ্যাডাপ্ট করতে গিয়ে আমাদের শেখার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে। প্রতি বছর আলাদা আলাদা কারিকুলাম আসায় আমাদের বেসিক ফাউন্ডেশন তৈরি হতে পারেনি। একটি শক্তিশালী প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষা ব্যবস্থা দরকার, যা ভবিষ্যতে উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। শিক্ষাক্রম বারবার পরিবর্তন হওয়ায় আমাদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে এবং বাস্তব জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর বিতর্ক এড়াতে বেশ কিছু অধ্যায় হঠাৎ করেই বাদ দেয়া হয়। যদিও বাদ দেয়া অধ্যায়গুলো বিদ্যমান জাতীয় শিক্ষাক্রমের মূল কাঠামোতেই রয়ে গেছে। শিক্ষকরা বলছেন, একটি কারিকুলামে অভ্যস্ত হয়ে দক্ষতা তৈরি হওয়ার আগেই আবার পরিবর্তন আসছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য কষ্টকর। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কারিকুলাম পরিবর্তন না করে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ২৫ বছর পর দেশে ও বিশ্ববাজারে কোন ক্যারিয়ার বেশি কার্যকর হবে, সে অনুযায়ী কারিকুলাম প্রণয়ন করা উচিত।
 
এদিকে পাঠ্যবইয়ের কাঠামোতেও এসেছে পরিবর্তন। কোথাও ইতিহাসের চরিত্র বদলেছে, কোথাও যুক্ত হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গ্রাফিতি ও আলোচনা। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিতর্কিত বিবর্তনবাদ বাদ দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তবমুখী বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির ‘শরিফার গল্প’ বা ট্রান্সজেন্ডার সংক্রান্ত বিষয় বাদ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন ইসলামী গল্প।
 
২০২৬ সালের পাঠ্যবইয়ে প্রতিটি শ্রেণিতে জুলাই বিপ্লব আন্দোলন, ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। ইতিহাস ও বাংলা বইয়ে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ও সাম্প্রতিক আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির গণিতে মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে জোর দেয়া হয়েছে।
 
ইংরেজি বইয়েও যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থীদের সাহসিকতা, বৈশ্বিক অর্জন এবং আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন অধ্যায়। তবে বারবার কাটাছেঁড়া ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে শিক্ষাব্যবস্থা ‘লাইফ সাপোর্টে’ চলে গেছে বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এনসিটিবি এখন আবার নতুন পাঠ্যপুস্তক তৈরিতে ব্যস্ত।
 
এনসিটিবির চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, কারিকুলাম রিভিউয়ের কাজ শুরু হয়েছে। টেকনিক্যাল টিম ও কোর টিম গঠন করা হয়েছে। লক্ষ্য পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম প্রস্তুত করা। শিগগিরই পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন এবং প্রিন্টিংয়ের কাজ শুরু হবে।
 
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, বিশ্বমানের শিক্ষার সঙ্গে তাল মেলাতে নতুন শিক্ষানীতি তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো পাইলটিংয়ে যাবে। প্রায় ২০০০ থেকে ৫০০০ শিক্ষার্থী নিয়ে ছয় মাসের পাইলটিং করা হবে। এরপর ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি মাস্টার ট্রেইনার তৈরি ও উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আগামী তিন-চার বছরে প্রাথমিক শিক্ষায় বড় পরিবর্তন আসবে।
 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষ জনবল ও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া এমন আমূল পরিবর্তন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, কারিকুলামের ভেতরের পরিমার্জনের জায়গাগুলো আগে চিহ্নিত করতে হবে। ২০২৭ সালের বইয়ের কনটেন্ট, বানান ও সিকোয়েন্স ঠিক করা বড় কাজ। মূল কাজ হলো শিক্ষাক্রমের স্থিতিশীলতা আনা। এনসিটিবির সমন্বয় ও উপকরণ তৈরিতে ঘাটতি রয়েছে, অনেক সময় বাইরের লোক নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ওঠে।
 
বিশ্লেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষাব্যবস্থা কোনো রাজনৈতিক ল্যাবরেটরি নয়। আধুনিকায়ন জরুরি হলেও তা হতে হবে পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি। এখন প্রশ্ন, শিক্ষাখাতের এই সংকট কি কাটবে, নাকি এনসিটিবির আমলাতান্ত্রিক জটেই আটকে থাকবে ভবিষ্যৎ? খামখেয়ালি ও ভুল সংশোধন করে শিক্ষা ব্যবস্থা কি শেষ পর্যন্ত পেশাদারিত্বের পথে ফিরতে পারবে?
Share.
Leave A Reply

Exit mobile version