Collected from: somoynews.tv
নগরীর অলিগলি পেরিয়ে এখন রাজধানীর প্রধান সড়কেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। অল্প সময়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই যানবাহন ঘিরে তৈরি হয়েছে বহুমুখী সংকট। একদিকে যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি, অন্যদিকে প্রায় দেড় কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। মহানগর থেকে এই বাহন সরিয়ে নিতে সরকারের নতুন পরিকল্পনার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক মতভেদ।
যানজটের কারণে রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। অর্থনীতির হিসাবে যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিশাল ক্ষতির অন্যতম কারণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের সড়কে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে ১০ থেকে ১২ লাখ রাজধানীর সড়ক দখল করে আছে। যানজটের পাশাপাশি এসব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন এসব যানবাহন চালাতে ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। যা জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ। টাকার হিসাবে যার পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, নিয়ন্ত্রণহীন এই অটোরিকশার যান্ত্রিক সক্ষমতা ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৫ শতাংশের পেছনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দায়ী।
যাত্রী ও পথচারীরা বলছেন, এই রিকশাগুলোতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। আগে অলিগলিতে চলাচল করলেও এখন প্রধান সড়কগুলোতেও এগুলোর দাপট দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অটোরিকশা চলাচল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গড়ে ওঠা অটোরিকশা ও চার্জিং পয়েন্টকেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসা। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা করছে বর্তমান সরকার।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, চালকদের জীবিকা ও রুটি-রুজির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্য কোথাও স্থানান্তরের সুযোগ আছে কি না, তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ঢাকা শহরের বাইরে নিবন্ধিত রিকশা রাজধানীতে চলাচল করতে পারবে না। ঢাকায় যেসব রিকশা রয়েছে, কেবল তারাই রাজধানীতে চলবে। সেই অনুযায়ী লাইসেন্স নির্ধারণ করা হবে। এমনকি উত্তরের রিকশাও দক্ষিণে চলাচল করতে পারবে না।
একদিকে সড়ক নিরাপত্তা ও যানজটের দীর্ঘদিনের সমস্যা অন্যদিকে লাখো মানুষের জীবিকা; সবকিছু মিলিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য নতুন রুট পারমিট কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হবে- সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অটোরিকশা খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় কোটি মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
আইনজীবী সাজ্জাদ-উল-ইসলাম বলেন,
হাইকোর্টে এ বিষয়ে একটি রিট বিচারাধীন রয়েছে। তবে সেখানে কোনো অন্তর্বর্তী আদেশ না থাকায় সরকার চাইলে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ সাইফুল নেওয়াজ বলেন,
ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সুস্পষ্ট নীতির ঘাটতি রয়েছে। যেসব ওয়ার্কশপে এসব রিকশা তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুরো পরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দেড় কোটি মানুষের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার কতটা ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান দিতে পারে- এখন সেটিই দেখার বিষয়।

