এখন চলছে ফসল আবাদের ভরা মৌসুম। এ মৌসুমে শরীয়তপুরে সারের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকদের চাহিদার বিপরীতে ৪৪ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কম সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অনেক স্থানে নিকটবর্তী বাজারে সার না পেয়ে দূরবর্তী বাজার থেকে কৃষকদের অতিরিক্ত দাম দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় উৎপাদিত ফসলের খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।
শরীয়তপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, শরীয়তপুরের ৬টি উপজেলায় ৮২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল আবাদ করেন কৃষকেরা। সেপ্টেম্বর মাস থেকে শরীয়তপুরের কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন শাকসবজি, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, রবিশস্য, তেলজাতীয় ফসল, ডালজাতীয় ফসল, মসলাজাতীয় ফসল, ধানের বীজতলা ও বিভিন্ন ধরনের ধানের আবাদ শুরু করেন। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত কৃষকেরা ওই সব ফসল আবাদ নিয়ে মাঠে ব্যস্ত থাকেন। এই চার মাস শরীয়তপুরে ফসল আবাদের ভরা মৌসুম। এ মৌসুমেই জেলায় সারের বরাদ্দ কম পাওয়া গেছে।
ফসলের এ মৌসুমে (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) শরীয়তপুরের ৮২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির ফসল আবাদের জন্য জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে সারের চাহিদা পাঠায়। যার মধ্যে ইউরিয়া ১৮ হাজার ৫৯৫ মেট্রিক টন, টিএসপি ৪ হাজার ৮১০ মেট্রিক টন, ডিএপি ১২ হাজার ৭৭৫ মেট্রিক টন, এমওপি ৮ হাজার ৯৯২ মেট্রিক টন। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয় সারের বরাদ্দ দিয়েছে কম। শরীয়তপুরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ইউরিয়া ৭ হাজার ৯৪৬ মেট্রিক টন, টিএসপি ১ হাজার ৭২৭ মেট্রিক টন, ডিএপি ৭ হাজার ৭৫ মেট্রিক টন, এমওপি ২ হাজার ২১৯ মেট্রিক টন। এ মৌসুমে চাহিদার চেয়ে কম পাওয়া গেছে ইউরিয়া ৫৭ শতাংশ, টিএসপি ৬৪, শতাংশ, ডিএপি ৪৪ শতাংশ এবং এমওপি ৭৫ শতাংশ।
শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের কাছে সার সরবরাহ করার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে মোট ৭১ জন ডিলার নিয়োগ দিয়েছে। সরকার–নির্ধারিত প্রতি কেজি ইউরিয়া ২৭ টাকা, টিএসপি ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা ও এমওপি সার ২০ টাকা দামে বিক্রি করতে হবে। ওই দামে কৃষক তাঁর প্রয়োজনীয় সার ডিলার পয়েন্ট থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।
চাহিদার চেয়ে কম সরবরাহ থাকায় ডিলার ও ডিলারদের নিয়ন্ত্রিত খুচরা ব্যবসায়ীরা বর্তমানে প্রতি কেজি সার ১০ থেকে ১২ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে মন্ত্রণালয় সারা বছরের চাহিদা নেওয়ার পর তার বিপরীতে বরাদ্দের তালিকা পাঠায়। ওই তালিকা জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাস অনুযায়ী বণ্টন করেন। তারপর ইউনিয়নভিত্তিক সারের ডিলারদের মধ্যে ওই ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই বরাদ্দ অনুযায়ী বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বিসিআইসি ও যশোরের নওয়াপাড়ায় থাকা বেসরকারি আমদানিকারকেরা ডিলারদের অনুকূলে সার সরবরাহ করেন।
কয়েকজন কৃষক জানান, শরীয়তপুরের কৃষকেরা ইউরিয়া, টিএসটি, ডিএপি ও এমওপি সার সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেন। প্রতি শতাংশ জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসলের জন্য তিন কেজি সার ব্যবহার করা হয়। যার সরকার–নির্ধারিত দাম ৮০ থেকে ৮২ টাকা। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় বর্তমানে ওই সার কৃষককে ১১০ থেকে ১২০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। প্রতি শতাংশ জমিতে কৃষককে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদিত ফসলের খরচ বাড়বে।
নড়িয়ার নশাসন এলাকার কৃষক মোকলেছ খন্দকার ১৬৫ শতাংশ জমিতে শীতকালীন শাকসবজি, পেঁয়াজ ও রসুন আবাদ করেছেন। ওই ফসলগুলোর জন্য তাঁর ২০ হাজার টাকার সার ক্রয় করতে হয়েছে। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় তাঁকে সার সংগ্রহ করতে সাড়ে ছয় হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে।
মোকলেছ খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাজারে ডিলারের কাছে গেলে বলেন সার পাই না, কোথা থেকে দেব? যা চাই, তার কম পাই। ফসল আবাদ করেছি, ফলন ভালো পেতে হলে সার তো দিতেই হবে। তাই বেশি দাম দিয়ে খুচরা দোকান থেকে কিনতে হয়েছে।’
জাজিরার ডুবলদিয়া এলাকার কৃষক হারুন মাদবর প্রথম আলোকে বলেন, ‘শর্ষে, ধনিয়া, কালিজিরা, পেঁয়াজ ও রসুনের আবাদ করেছি। বাজারে সারের দাম বেশি। প্রতিটি সার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। আমরা কৃষক, আমাদের কথা কে ভাবে? সার ও শ্রমিকের দাম বেশি। ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু বিক্রি করতে গেলে দাম পাই না।’
জানতে চাইলে বিএডিসির ফরিদপুর অঞ্চলের যুগ্ম পরিচালক এস এম ইকরামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। বিএডিসি ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আমদানি করে। আর ইউরিয়া বিসিআইসি সরবরাহ করে। মন্ত্রণালয় ও কৃষি বিভাগের বরাদ্দের তালিকা অনুযায়ী আমরা সেই সার ডিলারদের কাছে সরবরাহ করি। কোনো জেলায় চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দের ঘাটতি থাকলে তারা মন্ত্রণালয়ে উপবরাদ্দ চাইতে পারে। মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দিলে আমরা সরবরাহ দিতে পারব।’
শরীয়তপুর সার বিক্রেতা সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রব হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘সারের যা বরাদ্দ পাই, তা নির্ধারিত দামে বিক্রি করছি। অনেক সময় কিছু সার সরবরাহের ঘাটতি থাকে। তখন খুচরা বিক্রেতারা একটু বেশি দামে বিক্রির চেষ্টা করেন।’
শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, চাহিদা অনুযায়ী সারের বরাদ্দ কম আছে। কৃষক বিভিন্নভাবে ঘাটতি মোকাবিলা করছেন। বেশি দামে সার বিক্রি রোধে মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। প্রশাসনের সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের অতিমাত্রায় সার ব্যবহার না করে সুষম মাত্রায় ব্যবহার করা উচিত।
শরীয়তপুরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন চলছে অপেক্ষা, দুশ্চিন্তা এবং অপূর্ণ প্রত্যাশার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। বছরের এই সময়টায় সাধারণত কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন জমিতে সার দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার করা, পানির নিয়ন্ত্রণ, এবং ধানের বৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজে। কিন্তু ২০২৫ সালের এই মৌসুমে দৃশ্যপট ভিন্ন। মাঠে ধানের চারা ঠিকই আছে, গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে, বাতাসে দুলছে—কিন্তু কৃষকের মুখে সেই আগের মতো নিশ্চিন্ত হাসি নেই। সবকিছু যেন আটকে আছে এক জায়গায়—সার না পাওয়ার বেদনাদায়ক বাস্তবতায়।
শরীয়তপুরের কৃষকরা বলছেন, এটি যেন গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মৌসুম। শুধু আবহাওয়ার কারণে নয়, শ্রমিক সংকটের কারণে নয়, বরং এমন একটি জিনিসের অভাবে যা ছাড়া আধুনিক কৃষির অস্তিত্বই নেই—রাসায়নিক সার। কৃষকের ভাষায়, “সার ছাড়া জমি যেন শিকড়হীন গাছ”—দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু ফলন হয় না। আর সেই সারই যখন পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তাদের উদ্বেগ যে কতটা গভীর হতে পারে, তা বুঝতে অত বেশি কল্পনার দরকার হয় না।
শরীয়তপুর জেলা কৃষি বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে এ বছর কৃষকের মোট চাহিদার ৭৫ শতাংশেরও কম সার সরবরাহ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কৃষকের প্রয়োজন যদি ১০০ বস্তা হয়, তিনি পাচ্ছেন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ বস্তা। অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও কম। আর যারা পাচ্ছেন—তাদের কিনতে হচ্ছে অতিরিক্ত দামে, বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে। সার পাওয়ার জন্য আগের দিনে পরিচয়পত্র, কৃষি কার্ড, আবেদন—এগুলো প্রয়োজন হতো। কিন্তু এখন প্রয়োজন হয় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা, অপেক্ষা, ধাক্কাধাক্কি, অনিশ্চয়তা, আর কখনও কখনও হতাশা নিয়ে ফিরতে হওয়া।
কৃষক ফরিদ গাজী বলেন, “জমি আছে, বীজ আছে, পানি আছে। শুধু সার নাই। সার না দিলে গাছের রং বদলায়, ফলন কমে। আমরা তো আর ইচ্ছা করে দেই না—সরকার যদি না দেয়, আমরা কী করব?” শরীয়তপুরের কৃষকদের ভাষা একটাই—“সার ছাড়া কৃষি চলে না।”
ফরিদ শুধু একজন নয়। প্রায় প্রত্যেক কৃষকের গল্প একই। কেউ কেউ বলেন তারা তিনবার লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাননি। কেউ খালি হাতে ফিরে বাড়ি গেছেন শুধু এই ভেবে যে পরদিন আবার চেষ্টা করবেন। কারণ জমি অপেক্ষা করে না। ধান অপেক্ষা করে না। সময় মতো সার না দিলে ক্ষতি স্থায়ী, এবং তা আর ফিরে আসে না।
ডিলারদের কথাও ভিন্ন নয়। শরীয়তপুরের সার ডিলাররা বলছেন, তাদেরও সমস্যার শেষ নেই। তারা বলছেন, “সরকার বরাদ্দই কম পাঠাচ্ছে। আমরা কীভাবে সব কৃষককে দেব? আমাদের কাছে যখন ৫০ টন আসে, কৃষকের চাহিদা থাকে ১০০ টন। তাহলে বাকিরা কি রাগ করবে না?” এই রাগ অনেক সময় ডিলারের ওপর গিয়ে পড়ে। অথচ তারা নিজেরা সংকটে আছেন—বরাদ্দ কম, চাহিদা বেশি, অভিযোগ অসংখ্য।
ফসল গবেষকদের মতে, সারের এই সংকট শরীয়তপুরে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে আমন মৌসুমে মাত্র ৫–৭ দিনের পার্থক্যেই গাছের অবস্থার পরিবর্তন হয়। এক সপ্তাহ সার না পেলেই ধানের গাছ হলদেটে হয়ে যায়, শীষ কম ধরে, গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে, রোগ-বালাই বাড়ে। ফলে পুরো মৌসুমে ফলন কমে যেতে পারে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। শরীয়তপুরের মতো কৃষিনির্ভর জেলায় এটি শুধুমাত্র কৃষকের ক্ষতি নয়—এটি পুরো জেলার খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
একজন কৃষি কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সার আমদানি ও সরবরাহে সমস্যা আছে। তিনি বলেন, “আমাদের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পাই না। তবে আমরা চেষ্টা করছি। গ্রামের কৃষকেরা খুব চাপ দিচ্ছেন। কিন্তু আমরা যা পাই, তাই বিতরণ করতে পারি।”
কিন্তু কৃষকের সমস্যা শুধু কৃষি দপ্তরের ব্যাখ্যায় শেষ হয় না। তারা বলেন, “এ বছর যদি সারের সংকট থাকে, তো আগামী বছর বীজ সংগ্রহেও সমস্যা হবে। তখন আবার বীজের দাম বাড়বে। সবকিছুই চক্রাকারে ক্ষতির দিকে যাবে।” সত্যিই, কৃষি খাতের টেকসইতা একটি চক্রের ওপর নির্ভরশীল—ধান উৎপাদন কমলে বাজারে চালের দাম বাড়ে, গরীব পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কৃষকের আয় কমে যায়, গ্রামের অর্থনীতি দুর্বল হয়।
শরীয়তপুরের কৃষকেরা আরও একটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন—তাদের আশঙ্কা যে সারের সংকট তৈরি করে কেউ কেউ মজুতদারি এবং কালোবাজারি করছে। যদিও জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ বলছে তারা কঠোর নজরদারি করছে, কিন্তু কৃষকেরা বলেন বাস্তবতা এখনও অন্যরকম। অনেকেই অভিযোগ করেছেন যে সরকারি দামের বস্তা বাইরে বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে, আর সাধারণ কৃষকেরা সেটি পাচ্ছেন না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে সার কিনছেন।
বাজারে সারের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষকের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে কৃষকের উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়েছে। শ্রমিকের মজুরি, সেচের খরচ, বীজ, কীটনাশক—সব মিলিয়ে কৃষকের বাজেট এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। আর তার ওপর যখন সার না পাওয়া এবং অতিরিক্ত দামে কিনতে হওয়া—এটি তাদের জন্য আরও বড় আঘাত।
আরেক কৃষক জাকির হোসেন বলেন, “আগে একটা মৌসুমে ৫০–৬০ হাজার টাকা খরচ হতো। এখন লাগে ৯০ হাজার। আর যদি ফলন ঠিকমতো না হয়, তখন আমাদের কর্দমে পড়া ছাড়া পথ নেই।” কৃষকেরা বলেন, কৃষি এখন আর আগের মতো লাভজনক নয়। বরং ঝুঁকি বেড়ে গেছে। ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, বাজার অস্থিরতা এবং সারের মতো জরুরি উপকরণের সংকট তাদের চরম হতাশায় ফেলছে।
এই বাস্তবতার মাঝে অনেক কৃষক দুশ্চিন্তায় রাত কাটাচ্ছেন। তাদের ভয়—যদি ফলন কমে যায়, তাহলে ব্যাংকের কিস্তি কীভাবে দেবেন, জমির লিজ ভাড়া কীভাবে পরিশোধ করবেন, সংসারের খরচ চলবে কীভাবে, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে কিনা। কৃষকেরা মনে করেন, নীতি-নির্ধারকদের কাছে তাদের কণ্ঠ পৌঁছায় না। তারা বলেন, “আমরা তো মাঠের লোক। আমাদের কথা শোনার কেউ নাই। সমস্যা হলে আমরা সহ্য করি, সমাধান কেউ দেয় না।”
এই সমস্ত সমস্যার কারণে কৃষি বিভাগ, কৃষক এবং ডিলার—সবাই এক ধরনের জটিল অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছেন। আর এই অবস্থার উন্নতি না হলে, শরীয়তপুরের কৃষি অর্থনীতি তীব্র সংকটে পড়তে পারে। কৃষকেরা আশা করছেন—সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে, বরাদ্দ বাড়াবে, বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে।
শরীয়তপুরের কৃষকরা বর্তমানে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা শুধু একটি মৌসুমি সংকট নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। সারের সংকট দেখা দিলেই সাধারণ মানুষ ভাবেন, হয়তো সরবরাহ কম, কিংবা আমদানিতে সমস্যা হয়েছে, অথবা ডিলারদের মধ্যে সঠিকভাবে বিতরণ করা হয়নি। কিন্তু আসলে বিষয়টি আরও গভীর। এই সংকটের শিকড় ছড়িয়ে আছে দেশের সার নীতি, আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা, স্থানীয় প্রশাসনিক গাফিলতি, মজুতদারি চক্র, এবং কৃষকের বাস্তব সমস্যাকে গুরুত্ব না দেওয়ার পুরোনো প্রবণতার মধ্যে।
শরীয়তপুরের কৃষক আবুল কালাম বলেন, “যেদিন লাইনে দাঁড়াই, সেদিন মনে হয় যেন যুদ্ধ করতে আসছি। ঠেলাঠেলি, ঝগড়া—সব কিছুই হয়। সার না পাওয়া মানে জমিতে আগুন লাগার মতো অবস্থা।” তিনি যে ‘যুদ্ধ’-এর কথা বলেন, সেটি কেবলই একটি লাইন নয়—এটি একটি কৃষি অঞ্চলের পুরো জীবনের সংগ্রামের প্রতীক। যখন কোনো কৃষক সার না পাওয়ার কারণে ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার ভয় পান, তখন তিনি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা ভাবেন না; তিনি ভাবেন পরিবারের ভবিষ্যৎ, বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা, ঋণের বোঝা, সন্তানের পড়াশোনা—সবকিছু নিয়ে।
শরীয়তপুরে সারের সংকট কেন এত গুরুতর আকার ধারণ করছে? এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন। সার উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের দেশের। ফলে বৈশ্বিক সংকট দেশের স্থানীয় বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
দ্বিতীয়ত, সরকারের সার বরাদ্দ প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং জেলা পর্যায়ে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব।
আর তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে দুর্বলতা—যার কারণে বাস্তব চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে বড় ফাঁক থেকে যায়।
কৃষকেরা বলছেন, সারের সংকট মোকাবিলায় কোনো আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। বরাদ্দ যখন কমে গেল, তখনই প্রশাসন সক্রিয় হলো। কিন্তু ততক্ষণে কৃষকের ক্ষতি হয়ে গেছে। তাদের মতে, যদি আগে থেকেই পরিস্থিতি বোঝা যেত, তাহলে অতিরিক্ত আমদানির পরিকল্পনা করা যেত, ডিলারদের আগেই সতর্ক করা যেত, এবং কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেত।
ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি—এই তিন ধরনের সারই বর্তমানে সংকটের মুখে। এর মধ্যে ইউরিয়ার সংকট সবচেয়ে বেশি। কারণ ধানের বৃদ্ধিতে ইউরিয়ার ভূমিকা অপরিবর্তনীয়। শরীয়তপুরে এই সংকটের ফলে মাঠে ধানের রং পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। অনেক কৃষক চোখের সামনে ধানগাছ হলদেটে হয়ে যেতে দেখছেন। তারা জানেন, এটি কোনো সাধারণ সমস্যা নয়। শস্যের রং পরিবর্তন মানেই উৎপাদন কমে যাওয়া। আর উৎপাদন কমে গেলে তাদের পুরো মৌসুমই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, সারের ঘাটতি একটি সমন্বিত সংকট। এটি শুধু কৃষকের সমস্যা নয়—এটি দেশের সামগ্রিক খাদ্যনীতির সমস্যা। কারণ ধান শুধু খাদ্যশস্যই নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। শরীয়তপুরের মতো জেলায় ধান উৎপাদন কমে গেলে শুধু চালের দামই বাড়বে না, মাঠের শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কমবে, পশুখাদ্যের সংকট হবে, পরিবারের আয় কমে যাবে, এবং এতে দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য বাড়তে পারে।
শরীয়তপুরের জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় নেতারা বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা বলছেন—কেউ দোষ দিচ্ছেন কেন্দ্রকে, কেউ কৃষি বিভাগকে, কেউবা আমদানি নীতিকে। কিন্তু কৃষকেরা মনে করেন, দোষারোপে নয়—প্রয়োজন দ্রুত সমাধান। তারা চান—বরাদ্দ বাড়ানো হোক, বাজারে নজরদারি হোক, এবং কৃষকের হাতে যথাসময়ে সার পৌঁছে দেওয়া হোক। কারণ কৃষি মৌসুম অপেক্ষা করে না। এই মৌসুমে যদি সার না পাওয়া যায়, আগামী মৌসুমেও ক্ষতি বহন করতে হবে।
তবে শুধু সারের সংকটই নয়—এই সংকট আরও একটি বড় বাস্তবতা সামনে এনেছে। তা হলো কৃষকের প্রতি নীতি-নির্ধারকদের দৃষ্টি ও সংবেদনশীলতার অভাব। দেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হলেও কৃষকেরা কখনও নীতিনির্ধারণের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন না। ধান, চাল, পেঁয়াজ, রসুন—এগুলোর দাম বাড়লে বা কমলে আলোচনা হয়; কিন্তু কৃষকের জীবন, তার সংগ্রাম, তার ক্ষতি—এসব নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না।
ফলে কৃষকেরা ভাবেন, “আমাদের কথা কেউ শোনে না।” তাদের সংকট যখন চরম হয়, তখন তদারকি দল, প্রশাসন, পুলিশ এগিয়ে আসে। কিন্তু সংকট দেখা দেওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
এখন শরীয়তপুরে দেখা যাচ্ছে, কৃষকেরা ব্যয় বাড়ছে, আয় কমছে। কিন্তু উৎপাদন কমে গেলে দেশের খাদ্য ভারসাম্য নষ্ট হবে। বাজারে চালের দাম বাড়বে। মধ্যবিত্ত—গরিব—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষকের ক্ষতি মানে দেশের ক্ষতি—এটি এখন আর তাত্ত্বিক কথা নয়, বরং বাস্তবতা।
পরিস্থিতি উন্নত করতে হলে প্রথমে সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ বাড়াতে হবে। মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা—কৃষকের কথা শুনতে হবে, তাদের প্রয়োজন বুঝতে হবে।
এখনকার সংকট শুধু কৃষক নয়—একটি জেলাকে, একটি খাদ্যব্যবস্থাকে, একটি অর্থনীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আর এখন সময় এসেছে—সমাধান দিতে হবে, কথা নয়।


