মানুষ মরণশীল—এ সত্যটি আমরা জানি, তবু কোনো প্রিয় মানুষের বিদায় আমাদের হৃদয়ে গভীর শূন্যতা তৈরি করে। আব্দুর রব স্যারের মৃত্যু সেই অনিবার্য সত্যকে নতুন করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। আব্দুর রব স্যার ছিলেন ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠ পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক। তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন নৈতিকতার পথপ্রদর্শক, জ্ঞানের আলোকধারক এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর স্নেহ, প্রজ্ঞা ও আন্তরিক আচরণ আজও আমাদের স্মৃতিতে জীবন্ত। এই মহান শিক্ষক আজ ২১ নভেম্বর ২০২৫ শুক্রবার সকাল ১০:৩৫ ঘটিকায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরলোকগমন করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আমার পরম সৌভাগ্য যে, ২০০৪ সালে পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সূচনালগ্নে উনার মতো একজন অভিজ্ঞ, কর্মবীর, নিবেদিত প্রাণ সহকারী প্রধান শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। পরে প্রধান শিক্ষক হিসেবেও তাঁকে পাই। তাঁর সান্নিধ্যে থাকা মানে ছিল শেখা—শুধু বইয়ের পাতা থেকে নয়, বরং জীবন থেকে। তিনি ছিলেন দায়িত্বশীলতা ও শৃঙ্খলার মূর্ত প্রতীক। রোজ সকালে তিনি সবার আগে অফিসে এসে নিজের কাজের জায়গাটা পরিপাটিভাবে গুছিয়ে নিতেন। স্যারের অধীনে চাকুরীকালে কখনো স্যারকে দেরীতে স্কুলে আসতে দেখিনি। বিদ্যালয়ের প্রতিটি কার্যক্রম—সমাবেশ, ক্লাস, মিটিং, পরীক্ষার প্রস্তুতি—সবকিছুতেই স্যারের উপস্থিতি ছিল সময়ের নিখুঁত হিসাব মেনে। তাঁর এ অভ্যাস সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছিল।
বিষয় শিক্ষক হিসেবেও স্যারের ছিল সুবিশাল পাণ্ডিত্য। ইংরেজি গ্রামার বোঝানোর কৌশল ছিল অসাধারণ। স্যারের কাছে গ্রামারের কোন বিষয় সহকর্মী হিসাবে বুঝতে গেলে স্যার এতই চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দিতেন যেন মনে হতো গ্রামার কোনো কঠিন বিষয় নয়, বরং এক সুন্দর যুক্তির শৃঙ্খল। তিনি এমনভাবে বোঝাতেন যেন প্রতিটি বিষয় মনে হতো সহজ, বোধগম্য ও জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। স্যারের বিশেষ দক্ষতা ছিল গ্রামারের কঠিন বিষয়কেও সহজ-সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা করার। তাইতো পার্শবর্তী ক্লাস থেকেও স্যারের ভয়েস স্পষ্ট শোনা যেত এবং শিক্ষার্থীরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্যারের গ্রামারের ক্লাস উপভোগ করতো। অনেক শিক্ষার্থীকে বলতে শুনেছি- আগে গ্রামারের যেসব বিষয় মুখস্ত করে আয়ত্ত করতাম সেগুলি এখন স্যারের ব্যাখ্যায় চোখের সামনে ছবির মতো স্পষ্ট হয়ে যায়।
স্যারের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল—ধৈর্য। সহকর্মী হিসেবে কোন ভুল-ত্রুটি করলে স্যার বিরক্ত হতেন না, বরং হাসিমুখে গল্পের ছলে ভুলগুলি একান্তে ডেকে নিয়ে ধরিয়ে দিতেন বা ব্যাখ্যা করতেন। স্যারের সাথে কাজ করতে করতে আমরা শিখেছি নিরহঙ্কার থেকে কীভাবে বড় হওয়া যায়, কীভাবে ধৈর্য ধরে সব চাপ সামলাতে হয়, আর কীভাবে মানুষের প্রতি ভালোবাসা অটুট রেখে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা যায়।
আব্দুর রব স্যারের চলে যাওয়া আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য আলোকবর্তিকা—যারা তাঁর কাছ থেকে পাওয়া মূল্যবোধ, চরিত্রগুণ ও শিক্ষার আলো ভবিষ্যতেও ছড়িয়ে যাবে দূর–দূরান্তে। তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করাই হবে আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আমরা পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় পরিবার তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। মহান আল্লাহ পাক স্যারকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।
লেখকঃ মোহাম্মদ নূর আলম, সহকারী শিক্ষক, পঞ্চখণ্ড হরগোবিন্দ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, বিয়ানীবাজার।

