সিলেটে একটি ব্যস্ত সড়কে ভোরবেলার নরম আলো ফুটতে না ফুটতেই ঘটে যায় একটি হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। ব্যক্তিগত একটি কার এবং বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মালবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই একজন নিহত হন এবং আরও পাঁচজন আহত হন। এলাকায় মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক ও শোকের ছায়া।
এই সড়কটি সিলেট শহর থেকে কিছুটা দূরে হলেও প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই পথ দিয়ে চলাচল করেন। ভোরবেলায় সাধারণত যানবাহন কম থাকে, তবে যে কয়েকটি গাড়ি চলে—তাদের বেশিরভাগই দ্রুতগতিতে চলে যায়। আজও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
ভোরের দিকে হঠাৎই শোনা যায় এক প্রচণ্ড শব্দ। আশপাশের দোকানপাট তখনও খুলে হয়নি, তবে কয়েকজন স্থানীয় পথচারী, ডিউটিরত শ্রমিক ও সকালের দিকে কাজে বের হওয়া মানুষ সেই শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান রাস্তার মাঝামাঝি জায়গায় একটি কার মারাত্মকভাবে চূর্ণবিচূর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। বিপরীত পাশে মালবাহী ট্রাকটিও থেমে গেছে, তবে তার সামনের অংশ বেঁকে গেছে এবং রাস্তার ধুলো মাটি উড়ে ছড়িয়ে গেছে।
কারের ভেতরে পাঁচজন মানুষ আটকে ছিলেন। স্থানীয়রা প্রথমে দরজা খুলতে চেষ্টা করেন, কিন্তু দরজা বাঁকিয়ে গিয়ে আটকে ছিল। কয়েকজন লোহার রড এবং কাঠ নিয়ে এসে জানালার কিছু অংশ ভেঙে আহতদের বের করতে সহায়তা করেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্রুত এসে উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। পরে পুলিশও ঘটনাস্থলে পৌঁছায়।
দুর্ঘটনায় একজন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। তাকে গাড়ি থেকে বের করার সময় স্থানীয়দের চোখে দেখা যায় শোক ও হতবিহ্বলতা। আহত পাঁচজনকে দ্রুততর সময়ের মধ্যে নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠানো হয়। চিকিৎসকেরা জানান, তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর হলেও চিকিৎসা চলছে।
দুর্ঘটনার পরপরই পুলিশ রাস্তার উভয় পাশ বন্ধ করে দেয়। যানচলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় দীর্ঘ গাড়ির সারি জমে ওঠে। এদিকে অনেক পথচারী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আহতদের স্বজনেরা হাসপাতালে ছুটে যান। প্রতিটি মানুষই আতঙ্কে ছিলেন, কারা আহত হয়েছে, কারা নিহত—এই অনিশ্চয়তা সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কী ছিল। তবে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হয় যে, হয়তো কোনো একটি গাড়ি গতি হারিয়ে অন্য লেনে ঢুকে পড়ে। ভোরের সময় অনেক সময় কুয়াশা পড়েও থাকে, যার কারণে দৃশ্যমানতা কমে যায়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ওই সড়কের কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারাধীন, ফলে অসমান রাস্তা অনেক গাড়িকে নিয়ন্ত্রণ হারাতে বাধ্য করে।
ট্রাকচালককে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ব্যক্তিগত কারটি হঠাৎ তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। অন্যদিকে গাড়িতে থাকা একজন আহত যাত্রীর মতে, ট্রাকটি অনেক দ্রুতগতিতে আসছিল এবং হঠাৎ পাশ দিয়ে ছুটে এসে ধাক্কা দেয়। দুই পক্ষের বক্তব্য নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তদন্ত চালাচ্ছে।
এই সড়কটি দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এখানে সড়কবাতির অভাব, সিগন্যালিং সমস্যা, এবং ট্রাকের অতিরিক্ত গতির কারণে প্রায়ই ছোট–বড় দুর্ঘটনা ঘটে। গত মাসেও একই স্থানের কাছাকাছি একটি মাইক্রোবাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়েছিলেন।
প্রশাসনের কাছে বহুদিন ধরে দাবি উঠছিল যে এই সড়কে ক্যামেরা, স্পিড লিমিট সাইন এবং স্ট্রিটলাইট বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু এখনো অনেক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নিহত ব্যক্তির পরিচয় জানার পর তার পরিবার ভেঙে পড়ে। পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তিনি ভোরে জরুরি কাজে বের হয়েছিলেন এবং তাদের কল্পনাতেও ছিল না যে এই যাত্রাই হবে তার শেষ যাত্রা।
আহতদের পরিবারও হাসপাতালে ছুটে গিয়ে প্রার্থনা করছেন প্রিয়জনদের সুস্থতার জন্য। কেউ কেউ হাসপাতালের বাইরে বসে কান্না করছেন, কেউ আবার ভেতরে দৌঁড়াচ্ছেন চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলার জন্য।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার সঠিক কারণ প্রকাশ করা হবে। যদি কেউ নিয়ম ভেঙে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সড়ক নিরাপত্তা জোরদার করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, দুর্ঘটনার প্রভাব স্থানীয় মানুষের মাঝে গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। অনেকে বলেছেন, সড়কে নিয়ম মানা এবং সতর্কভাবে চলাচল করাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। তবে রাস্তার মান খারাপ হলে চালকদের সবসময়ই ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
এই ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত অবকাঠামো, সচেতন চালক এবং কঠোর আইনের সমন্বয় ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়।
ঘটনার পর কিছু সময় রাস্তা পরিষ্কার করতে কাজ চালায় পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। ট্রাক ও কার দুটি সরিয়ে নেওয়ার পর ধীরে ধীরে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।
তবে মানুষের মনে এখনো ছাপ রয়ে গেছে সেই ভয়াবহ মুহূর্তের। অনেকে ভিডিও ও ছবি তুলেছেন, যা সামাজিকমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে সারা অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।
এভাবেই একটি সকাল হয়ে উঠল বিষাদের। একজন মানুষকে হারাতে হলো, পাঁচজন আহত হয়ে হাসপাতালে জীবনযুদ্ধে লড়ছেন।

