Collected from: tsports.com
ম্যাচ জিতে ভাইকিং রো, নেতৃত্ব দেন নরওয়ে অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। গ্রুপ রাউন্ড থেকে নরওয়ে ফুটবল দলের এই ব্যতিক্রমী উৎসবের সাথে পরিচিত হয়েছে ফুটবল বিশ্ব। আই গ্রুপে ইরাক, সেনেগাল, রাউন্ড অব ৩২-তে আইভরি কোস্টকে হারিয়ে এই উৎসব ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিপক্ষে রাউন্ড অব ১৬-এর ম্যাচে মেট লাইফ স্টেডিয়ামে ভাইকিং রো উৎসবে হলুদ রঙ হয়ে পড়বে বর্ণহীন, এতোটা কল্পনায়ও ভাবেনি অনেকে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিলের ১৯৬৬-তে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়াটা বড় ট্র্যাজেডি। ১৯৮২ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় গ্রুপ স্টেজ থেকে বাদ পড়ার দুঃসহ স্মৃতি অনেক আগেই মুছে ফেলেছে ব্রাজিলীয়রা। ২০০২ বিশ্বকাপের ট্রফিতে হাত দেওয়ার পর টানা ৬টি আসরে শুধু হতাশাই বাড়িয়েছে সেলেকাওরা। এই ৬ আসরের মধ্যে একবার সেমিফাইনাল, ৪ বার কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে সমর্থকদের কিছুটা হলেও সান্ত্বনা দিতে পেরেছে। কিন্তু এবার তো রাউন্ড অব সিক্সটিনেই থামলো ব্রাজিল !
কেনো এমনটা হলো। তা নিয়ে গবেষণা চলবে বহুদিন, বছরের পর বছর। তবে নিউ ইয়র্ক-নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে এই ম্যাচটিতে ব্রাজিল-নরওয়ে মুখোমুখি হওয়ার আগে ইতিহাস অবশ্য ছিল নরওয়ের পক্ষে। ইতোপূর্বের ৪টি হেড টু হেড লড়াইয়ে ২টি জয়ের পাশে ২টি ড্র-এ নরওয়ের অতীত রেকর্ডটা এদিন ব্রাজিলকে করেছে সতর্ক, খেলার শুরু থেকে ছিল তাঁর প্রতিফলন। ব্রাজিলের ছন্দময় ফুটবল দেখে প্রতিপক্ষও মুগ্ধ হবে, পেছন পেছন দৌড়াবে, ব্রাজিলের এই পরিচিত ফুটবল কী সোমবার দেখেছে কেউ ? উল্টো নরওয়ের মাঝ মাঠের নিয়ন্ত্রন দেখে হতাশার প্রতিচ্ছবিই ছিল ব্রাজিল ফুটবলারদের চোখে-মুখে। খেলার পরিসংখ্যান সে কথাই বলবে। বল দখলে নরওয়ের ৬৬% এর বিপরীতে ব্রাজিলের পায়ে ছিল ৩৫% সময় বল। নরওয়ের ৬১৭টি পাসের বিপরীতে ব্রাজিল দিতে পেরেছে ২৭৯টি পাস। টার্গেটে শট নেয়ার ক্ষেত্রেও নরওয়ে এগিয়ে ৫-৪-এ!
বছরে ৫০ মিলিয়ন ইউরো চুক্তিতে ইতালি থেকে আমদানীকৃত কোচ কার্লো আনচেলোত্তি নরওয়ের বিপক্ষে ফরমেশনটাই ঠিক ঠাক মতো সাজাতে পারেননি। রাউন্ড অব ৩২-তে জাপানের বিপক্ষে তাঁর ফরমেশন ছিল ৪-১-২-৩। সেই ম্যাচে ক্যাসিমিরোকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের দায়িত্ব দিয়ে তিন স্ট্রাইকারকে উপরে রেখেছেন তিনি সারাক্ষণ। অথচ, নরওয়ের বিপক্ষে বেছে নিয়েছেন এই ইতালীয় কোচ ৪-৪-২ ফরমেশনকে। স্ট্রাইকিং পজিশনে রেখেছেন কুনহা এবং ভিনিসুসকে।
তাঁর এই স্ট্র্যাটেজিই বুমেরাং হয়েছে। কুনহা মাঠে ছিলেন ৫৮ মিনিট, এই সময়ে তিনি দিতে পেরেছেন মাত্র ২৩টি পাস। তাঁর বদলে এনরিককে নামিয়েও লাভ হয়নি। ৩২ মিনিটে মাত্র ৯টি পাস দিতে পেরেছেন এনরিক। ড্রিবলিংয়ে এদিন সুবিধা করতে পারেননি আর এক স্ট্রাইকার ভিনিসুস জুনিয়র। ৪৬টি পাসে থেমেছেন তিনি। মধ্যমাঠে ফ্লপ ছিলেন ব্রুনো। ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ছিলেন মাঠে। এই সময়ে দিতে পেরেছেন টিমমেটদের মাত্র ৩৮টি পাস। ক্যাসিমিরো অবশ্য এগিয়ে ছিলেন অন্যদের চেয়ে। মিড ফিল্ডারের দায়িত্ব পাওয়া এই ফুটবলার দিয়েছেন টিমমেটদের ৫১টি পাস।
আনফিট খেলোয়াড় নেইমার দলের জন্য কতোটা বোঝা, তা রাউন্ড অব ১৬-এ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন ব্রাজিল কোচ। খেলার ৬৭ তম মিনিটে নেইমারকে নামিয়ে হাততালি পেয়েছেন তিনি। তবে ২৩ মিনিটের খেলায় ব্রাজিল সমর্থকদের আশ্বস্ত করতে পারেননি তিনি। এই সময়ে ২১টি পাস দিয়েছেন, খেয়েছেন হলুদ কার্ড। শেষ মিনিটে রেফারির উপহার পেনাল্টি থেকে গোল দিয়েও নরওয়ে ফুটবলারদের সাথে তর্কে জড়িয়েছেন।
অন্যদিকে নরওয়ে কোচ স্টালে সোলবাকেন ব্রাজিলের বিপক্ষে বেছে নিয়েছেন অ্যাটাকিং ফুটবল, ৪-৩-৩ ফরমেশন। নরওয়ের ফুটবলার হিসেবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারানোর সুখস্মৃতি ফিরে পেতে এদিন মধ্যমাঠে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন তিনি ডেগার্ড এবং বার্জে-কে। হলান্ডকে ফ্রি রেখে ব্রাজিলের রক্ষণভাগে আক্রমনের নেতৃত্ব দিতে এই দুই মিডফিল্ডারের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া ছিল চোখে পড়ার মতো। ডেগার্ড দিয়েছেন ১২৪টি পাস। বার্জের পাস সংখ্যা সেখানে ১৩০। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ফরোয়ার্ড স্টালে সোলবাকেনকে মাঠে নামিয়ে নরওয়ে কোচ দিয়েছেন খেলার চিত্র পাল্টে। ৪৫ মিনিট খেলেছেন এই ফুটবলার। দিয়েছেন ৪১টি পাস। নরওয়ের যে গোল এসেছে হলান্ডের মাথা এবং পা থেকে, ওই দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন সোলবাকেন।
পেপ গার্দিওয়ালার প্রধান অস্ত্র হয়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে ম্যান সিটিকে চ্যাম্পিয়ন করার নায়ক আর্লিং হলান্ড ৫ মৌসুমে ১৩২ ম্যাচে ১১২ গোলে খ্যাতি পেয়েছেন গোল মেশিন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচের চেয়ে অধিক গোলে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া (৫৪ ম্যাচে ৬২ গোল) এই দীর্ঘদেহী ফরোয়ার্ড সোমবার কাজের কাজ করেছেন। হাফ চান্সকে ফুল চান্স বানিয়েও যে গোল করা যায়, ব্রাজিলের জালে দুবার বল জড়িয়ে অন্তত তা জানিয়ে দিয়েছেন। সারাক্ষণ উপরে থেকে টিমমেটদের পাসের অপেক্ষায় থাকা এই ফরোয়ার্ড পুরো ম্যাচে মাত্র ৩০টি পাস দিতে পেরেছেন, তাতে কি ? ব্রাজিলের একাধিক ডিফেন্ডারের মার্কিং কিন্তু ঠিকই এড়াতে পেরেছেন তিনি। ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতাও স্পট হেড-এর ক্ষেত্রে পেয়েছে বাড়তি সুবিধা। তাঁর জাদুতেই ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে নরওয়ে। এই প্রথম বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের নাগাল পেয়েছে নরওয়ে।
চলমান বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুটের লড়াইটা জমিয়ে দিয়েছেন হলান্ড। মেসি-এমবাপ্পের সাথে ৭ গোল করে যৌথভাবে হলান্ডও আছেন শীর্ষে।
ভাইকিং শব্দটি বলতে স্ক্যান্ডিনেভীয় সমুদ্রচারী জলদস্যু, আক্রমণকারী বা ব্যবসায়ীদের বোঝায়, যারা অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন অংশে লুটপাট চালিয়ে বসতি স্থাপন করেছিল। কালের বিবর্তনে তাদের প্রজন্মরা এখন নরডিক, তাঁরাই ফুটবল বিশ্বকে মনে করিয়ে দিয়েছে হাজার বছর আগের প্রজন্মের জলদস্যুদের নৌপথে আক্রমনের কথা। ভাইকিংস রো-তে হলান্ডদের সমস্বরে সেই আক্রমনে ছিন্ন ভিন্ন ব্রাজিল এখন দেখছে দুস্বপ্ন।

