Collected from: tsports.com
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ বলে কথা! স্বাভাবিকভাবেই নকআউট পর্ব শুরু হওয়ার আগেই ২০২৬ সালের গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে লেখা হয়েছে প্রায় ৩২টি রেকর্ড। যেখানে ৮টিই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক লিওনেল মেসির দখলে।
৪৮ দলের এই বর্ধিত টুর্নামেন্টে ম্যাচের সংখ্যা বেশি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই এবার গোল হয়েছে সবচেয়ে বেশি (২১৫টি) এবং গ্যালারিতে দর্শক উপস্থিতিও ছাড়িয়ে গেছে আগের সব রেকর্ড।
গ্রুপ পর্ব শেষে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নাম লেখানো এমন কিছু অবিশ্বাস্য রেকর্ড ও পরিসংখ্যান নিচে তুলে ধরা হলো।
লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো
পেশাদার ফুটবলার হিসেবে সম্ভবত নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে নামা আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি ২৩তম বিশ্বকাপে গোলবন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। সোনালী ট্রফির ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি গোল (১৯টি), সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা (২৯টি), সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয় (১৯টি) এবং সবচেয়ে বেশি সময় (২,৪৯০ মিনিট) মাঠে থাকার রেকর্ড এখন মেসির দখলে।
টুর্নামেন্টে টানা সবচেয়ে বেশি ম্যাচে (৭টি) গোল করার রেকর্ড গড়ে মেসি পেছনে ফেলেছেন জাইরজিনহো এবং জুস্ত ফন্টেইনকে। পেলের করা বিশ্বকাপে ২১টি গোলে অবদান রাখার (গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে) রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছেন তিনি। এই বিশ্বকাপে করা ৬টি গোলসহ টুর্নামেন্টের ইতিহাসে এখন তার মোট অবদান ২৭টি গোলে।
তবে ইন্টার মিয়ামির এই তারকা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও নিজের ঝুলিতে পুরেছেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করায় বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি মিস (৩টি) করা খেলোয়াড়ও মেসি।
মেসি এবং পর্তুগালের রোনালদো বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ৬টি বিশ্বকাপে খেলার কীর্তি গড়েছেন। মেক্সিকোর গোলকিপার গুইলারমো ওচোয়াও অবশ্য ৬টি বিশ্বকাপে দলে ছিলেন। তবে ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপে তাকে সাইডবেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল। এছাড়া রোনালদো ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৬টি বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন। ৪১ বছর বয়সে গোল করে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বয়সী গোলদাতা এখন।
অভিজ্ঞদের রাজত্ব
৪০ বছর ২৯১ দিন বয়সে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মদরিচ বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোলে অ্যাসিস্ট (সহায়তা) করার রেকর্ড গড়েছেন। ঘানার বিপক্ষে নিকোলা ভ্লাসিচের জয়সূচক গোলটিতে কর্নার থেকে বল বাড়িয়েছিলেন তিনিই।
অন্যদিকে, পানামার বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে জর্ডান হেন্ডারসন ইংল্যান্ডের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ৪টি বিশ্বকাপ এবং ৭টি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার অনন্য রেকর্ড গড়েন।
সফল ও প্রবীণ কোচদের কীর্তি
নরওয়েকে হারিয়ে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোচ হিসেবে সর্বোচ্চ ম্যাচ (১৭টি) জয়ের রেকর্ড গড়েছেন। এছাড়া একই দলের হয়ে টানা ৪টি বিশ্বকাপ ডাগআউটে থাকার রেকর্ডে তিনি যৌথভাবে ইংল্যান্ডের ওয়াল্টার উইন্টারবটম এবং পশ্চিম জার্মানির হেলমুট শনের পাশে বসেছেন।
ইরানের কোচ কার্লোস কুইরোজও যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৫টি বিশ্বকাপে কোচিং করানোর রেকর্ড (বোরা মিলুতিনোভিচের সাথে) ছুঁয়েছেন।
গত ২৫ জুন আইভরি কোস্টের বিপক্ষে কুরাসাওর শেষ গ্রুপ ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ডিক অ্যাডভোকাত (৭৮ বছর ২৭১ দিন) বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রবীণ কোচের রেকর্ড নিজের করে নেন।
এদিকে ৭৪ বছর ৭৫ দিন বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ম্যাচ জিতিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক জয়ী কোচ হয়েছেন হুগো ব্রোস। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে এই জয়ের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়।
গোলপোস্টের নিচে প্রাচীর ও ব্যর্থতা
৪০ বছর পার করার পর পিটার শিলটন (৩টি) এবং দিনো জপ (২টি) এর পর তৃতীয় গোলকিপার হিসেবে বিশ্বকাপে একাধিক ম্যাচে কোনো গোল না খাওয়ার (ক্লিন শিট) কীর্তি গড়েছেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা। পাশাপাশি ১৯৬৬ সালের পর থেকে ৪০ ঊর্ধ্ব গোলকিপারদের মধ্যে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ সেভ করার তালিকায় তিনি দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন। এছাড়া ৪০ বছর ১২ দিন বয়সে দেশের হয়ে প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েন তিনি, যা তার মাত্র একদিন আগেই গড়েছিলেন কুরাসাওর এলোয় রুম।
একই টুর্নামেন্টে ইকুয়েডরের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে কুরাসাওর গোলকিপার এলোয় রুম রেকর্ড বই ওলটপালট করে ১৫টি সেভ করেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের ম্যাচে এটিই সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড। এর আগে ২০১৪ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে আমেরিকার টিম হাওয়ার্ড ১৬টি সেভ করেছিলেন। তবে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়িয়েছিল।
স্পেনের বিপক্ষে উরুগুয়ের গোলকিপার ফার্নান্দো মুসলেরা বল হাত থেকে ফেলে গোল হজম করায় এক বিশ্বকাপে সরাসরি গোলকিপারের ভুলে ৩টি গোল খাওয়ার প্রথম রেকর্ড গড়েন।
২৩তম বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৫ বার গোলকিপার বদল করা হয়েছে। যা ২০১৪ বিশ্বকাপের পর এক আসরে যৌথভাবে সর্বোচ্চ।
অন্যান্য বিবিধ রেকর্ড
ভাইদের কীর্তি: ২৩তম বিশ্বকাপে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৫ জোড়া ভাই একসাথে খেলেছেন। যাদের ১০ জনের মধ্যে ৬ জনেরই জন্ম নেদারল্যান্ডসে। তবে ব্রায়ান ব্রোবি (নেদারল্যান্ডস) এবং ডেরিক লুকাশেন (ঘানা) ইতিহাসের প্রথম দুই ভাই, যারা বিশ্বকাপে দুটি ভিন্ন দেশের হয়ে গোল করার কীর্তি গড়েছেন।
কেপ ভার্দের ইতিহাস: বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট পর্বে পৌঁছানো সবচেয়ে ছোট দেশ কেপ ভার্দে। ১৯৯৮ সালে চিলির পর প্রথম দল হিসেবে কোনো ম্যাচ না জিতে, ৩টি ড্র করেই পরের রাউন্ডে উঠেছে তারা।
হ্যারি কেইনের রেকর্ড: গ্যারি লিনেকারকে (১০ গোল) ছাড়িয়ে হ্যারি কেইন এখন বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১১ গোল)। এর মধ্যে ৫টি এসেছে পেনাল্টি থেকে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্য সর্বোচ্চ।
ইংল্যান্ডের আক্ষেপ: ঘানার বিপক্ষে ম্যাচে ৭৮.৮ শতাংশ সময় বল নিয়ন্ত্রণে রেখেও গোল করতে পারেনি ইংল্যান্ড। গোল না করে এত সময় বল দখলে রাখার রেকর্ড ইতিহাসে আর নেই।
সেনেগালের চমক: গ্রুপ পর্বে ৮ গোল করে সেনেগাল বিশ্বকাপের ইতিহাসে যেকোনো আফ্রিকান দলের পক্ষে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড গড়েছে। ইরাককে ৫-০ গোলে হারিয়ে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে এক ম্যাচে ৫ গোল দেওয়ার কীর্তি গড়ে তারা। সেনেগালের ইলিমান এনদিয়ায়ে ইতিহাসের প্রথম বদলি খেলোয়াড় যিনি মাঠে নেমে একই সাথে গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট করেছেন, প্রতিপক্ষের বক্সে ৫ বার বল ছুঁয়েছেন এবং ৫ বার ড্রিবলিং করেছেন।
লুকাাকুর ম্যাজিক: নি জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে পুরো সময়ে মাত্র ৫ বার বল ছুঁয়েই গোল এবং অ্যাসিস্ট—উভয়ই করেছেন রোমেলু লুকাকু। এত কম টাচ করে দুটি গোলে অবদান রাখার রেকর্ড এটিই প্রথম।
রেফারির রেকর্ড: ইরানি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান রেফারি আলিরেজা ফাগানি এবং আর্জেন্টিনার সহকারী রেফারি হুয়ান পাবলো বেলাত্তি—দুজনেই সর্বোচ্চ ৪টি বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন।

