এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার একজন প্রতিনিধি আল জাজিরাকে বলেন, সহিংসতা প্রচারের অভিযোগে তাদের ইউটিউব চ্যানেল বন্ধ করা হয়েছে। তবে তাদের দাবি, লেগো ধাঁচের এসব অ্যানিমেশন মোটেও সহিংস নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘হতাশা ছিল, কিন্তু বিস্ময় নয় এ গল্প নতুন নয়। আমরা ভালো করেই জানি, পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে সত্যকে নীরবতার আড়ালে ঢেকে রাখে এবং সেই কণ্ঠগুলোকে স্তব্ধ করতে চায়, যারা সত্য বলার চেষ্টা করে।’
গভীর প্রতীকী অর্থ
ভিডিওগুলোতে কখনো দেখা যায় শিয়া মুসলিম ইতিহাসের গভীর ট্র্যাজেডি ও আধ্যাত্মিক বার্তা তুলে ধরা শোকাবহ কাহিনি, আবার কখনো লেগো স্টাইলের চরিত্র ও পরিবেশে তৈরি উচ্ছ্বসিত র্যাপ স্টাইলের মিউজিক ভিডিও। এসব ভিডিওতে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতীকী উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে।
এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার একজন মুখপাত্র বলেন, অ্যানিমেশনে ব্যবহৃত সবুজ ও লাল রঙের বিশেষ প্রতীকী অর্থ রয়েছে। তার মতে, সবুজ রঙ ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদের নাতি হযরত হুসাইনের প্রতিনিধিত্ব করে, যিনি অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক। আর লাল রঙকে নিপীড়কের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘এটি আসলে আমাদের দলের অন্যতম প্রিয় অ্যানিমেশন। বিশেষ করে সেই মুহূর্তটি, যখন যুদ্ধের হেলমেটগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ওপর বসানো হয় যা সত্যিই অসাধারণ ছিল।’
অন্যান্য ভিডিওতে ‘এপস্টেইন রেজিম’, ‘পরাজিত’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সমর্থকদের ‘ম্যাগা’ লেখা লাল টুপি পরা অবস্থায় দেখানো হয়েছে যা ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের প্রতীক। এসব ভিডিওতে ট্রাম্পের যুদ্ধ এড়ানোর প্রতিশ্রুতি এবং সাধারণ শ্রমজীবী আমেরিকানদের পাশে থাকার অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়, এরপর তার নিজের বক্তব্য ব্যবহার করে অভিযোগ করা হয় তিনি এসব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ইসরাইলের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
মুখপাত্র বলেন, “পরাজিত আমাদের অন্যতম সেরা কাজগুলোর একটি।’ ট্রাম্প প্রায়ই তার প্রতিপক্ষদের এ শব্দে সম্বোধন করেন। ‘আমরা সেটাকেই উল্টোভাবে ব্যবহার করে দেখিয়েছি, শেষ পর্যন্ত তিনিই সবচেয়ে বড় ‘পরাজিত’।” কিছু ভিডিওতে ট্রাম্প-সদৃশ একটি চরিত্রকে ছোট একটি পুতুল হাতে ধরে থাকতে দেখা যায়।
আরেকটি ভিডিও লেবাননের জনগণকে উদ্দেশ্য করে তৈরি করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তাদের একা ফেলে যাবে না। এটি এমন সময় প্রকাশিত হয়, যখন দেশটিতে মাত্র ১০ মিনিটে শতাধিক বোমা ফেলা হয়েছিল।
এই ভিডিও নির্মাতা দলের সদস্য সংখ্যা ১০ জন, যাদের বয়স ১৯ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। তাদের ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার আছে—এমনকি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ব্যবহার করছে, যদিও যুদ্ধ শুরুর পর ইরান সরকার এসব প্ল্যাটফর্মে সাধারণ নাগরিকদের প্রবেশ সীমিত করেছে।
আল জাজিরাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার মুখপাত্র স্বীকার করেছেন, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তাদের গ্রাহকদের মধ্যে অন্যতম। তবে তিনি দাবি করেন, দলটি স্বাধীনভাবে কাজ করে।
তিনি বলেন, ‘আমরা উচ্চমানের মিডিয়া কনটেন্ট তৈরি করি, তাই বিভিন্ন স্থানীয় গণমাধ্যম—যার মধ্যে কিছু রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্টও আছে—আমাদের কাজ সম্প্রচারের জন্য কিনে নেয়। বাস্তবে আমরা আগে কনটেন্ট তৈরি করি, এরপর যদি মান ভালো হয়, তখন মিডিয়া সংস্থাগুলো সেটি কিনে নেয়। এভাবেই আমাদের স্বাধীনতা পুরোপুরি বজায় থাকে।’
কোলাহল ভেঙে এগিয়ে যাওয়া
এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া একা নয়। পার্সিয়াবয়ি ও সাউদার্ন পাঙ্কসহ আরও অনেক নির্মাতা একই ধরনের লেগো-থিমের ভিডিও তৈরি করেছেন। এই প্রবণতা ইরানের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। পাকিস্তানেও স্থানীয় নির্মাতারা এতে যুক্ত হয়েছেন। ইসলামাবাদে ১১ এপ্রিল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রথম দফার আগে ‘নুকতা মিডিয়ার’ মতো স্থানীয় নির্মাতারা নিজস্ব সংস্করণ প্রকাশ করে।
ইসলামাবাদভিত্তিক সামাজিক বিশ্লেষক ফাসি জাকা বলেন, লেগো স্টাইলের এসব ভিডিওর মূল শক্তি হলো এগুলো একই সঙ্গে নানা বিষয়কে তুলে ধরতে পারে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রভাবে বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহ ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সময়ে সাধারণত যে তথ্যপ্রবাহ তাদের বিরুদ্ধে থাকে, এই ভিডিওগুলো সেটি ভেঙে সামনে আসার একটি উপায়।’
জাকার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দুর্বল দিক যেমন এপস্টেইন ইস্যু তুলে ধরার মাধ্যমে ভিডিওগুলো বেশ কৌশলী বার্তা দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ওরা একে ‘এপস্টেইন রেজিম’ বলছে, যা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের একটি বড় ফাটল। আবার তারা ম্যাগা নির্বাচন রাজনীতির প্রতীক বা ইসরাইলের স্বার্থে নতি স্বীকারের বিষয়টিও ব্যবহার করছে। বাইরে থেকে দেখলে মজাদার মনে হলেও আসলে এটি খুবই বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল।’
জাকা আরও বলেন, এসব ভিডিওতে গভীর প্রতীকী অর্থও রয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিন যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় মিনাব এলাকার একটি মেয়েদের স্কুলে বোমা হামলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যেখানে ১৬০ জনের বেশি ইরানি স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছিল।
তিনি বলেন, “যুদ্ধ শুরুই হয়েছিল ইরানি শিশুদের ওপর এক ভয়াবহ হামলার মাধ্যমে।’ তাই লেগোর মতো একটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত শিশু-কেন্দ্রিক ব্র্যান্ড ও ভিজ্যুয়াল ব্যবহার করার মাধ্যমে এই বার্তাগুলো এক ধরনের আবেগঘন সংযোগ তৈরি করে ‘সবকিছু যেন এক জায়গায় এসে মিলিত হয়’।
‘ব্যঙ্গ-প্রতিবাদের কঠোর জবাব’
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ইন কাতারের অধ্যাপক এবং মিডিয়া অ্যানালিটিকস গবেষক মার্ক ওয়েন জোন্স বলেন, আখ্যানের যুদ্ধ বা ‘ন্যারেটিভ ওয়ার’-এ ইরানের প্রচেষ্টা তাদের কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, কারণ তারা জানে যে সামরিকভাবে জয় পাওয়া তাদের জন্য কঠিন।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “তাদের সাফল্যের সবচেয়ে ভালো সুযোগ হলো জনমত নিজেদের পক্ষে আনা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরি হয় যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য।’ তার মতে, বর্তমান যুগে যোগাযোগের ক্ষেত্রটি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে ‘এই ধরনের ট্রল স্টাইলের প্রচারণা, বা ‘আক্রমণাত্মক ব্যঙ্গভাষার’ কনটেন্টই প্রভাব বিস্তার করে।”
তিনি আরও বলেন, লেগোস্টাইল ভিডিওতে যেসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো পশ্চিমা পাঠকদের আরও বেশি প্রভাবিত করতে পারত যদি এগুলো ইরান থেকে আসছে, এই পূর্বধারণা না থাকত। দশকের পর দশক ধরে পশ্চিমা বিশ্বকে ইরানের প্রতি অবিশ্বাসী হতে শেখানো হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষক জাকা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ইরানি ভিডিওগুলোর অপ্রচলিত কূটনৈতিক ভাষা ও কঠোর বার্তাবিনিময়ের ধরন ডনাল্ড ট্রাম্পের নিজের যোগাযোগের শৈলীর সঙ্গেই মিল রয়েছে।
জোন্স আরও বলেন, ‘সব মিলিয়ে ইরানের লেগো ভিডিওগুলো খুবই ভালোভাবে তৈরি। এগুলোতে চিন্তাভাবনা আছে, বিস্তারিত নকশা আছে, এবং একটি সুসংগঠিত বর্ণনাও রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রচারণা সাধারণত শুধু বিস্ফোরণ আর হলিউডধর্মী দৃশ্যের মিশ্রণ।’