১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনের সীমানাভুক্ত সংসদীয় এলাকায় ধানের শীষের বিজয় দেখেছিল কর্মী-সমর্থকরা। আসনটিতে এবার গত ৪৬ বছরের খরা ঘুচাতে চায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির প্রার্থী হিসেবে ভোটের লড়াইয়ে নামতে চান এমন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন অন্তত ১৫ জন। শেষ মুহূর্তে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন চার চৌধুরীর সঙ্গে দুই নেত্রী।
সিলেট-৬ আসনে ইসলামীদলগুলোসহ অন্যরা নিজেদের প্রার্থী চূড়ান্ত করলেও এখনো নির্ধারিত হয়নি বিএনপির প্রার্থী। তবে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকাটি ছোট হয়ে এসেছে। প্রতিযোগীতার মঞ্চে আছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠিত চার নেতা- বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা এনামুল হক চৌধুরী, সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া বিএনপি নেতা ফয়ছল আহমদ চৌধুরী এবং সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। যারা চার চৌধুরী নামে আলোচিত।

দলের প্রতিষ্ঠিত এই চার নেতার সঙ্গে মনোনয়নের দৌড়ে থেকে স্থানীয়দের দৃষ্টি কেড়েছেন দুই নারী। তাদের কেউ যদি এই আসনে এমপি হন, তবে সৃষ্টি হবে ইতিহাস। এদের মাঝে মাঠ পর্যায়ে এগিয়ে আছেন, প্রয়াত শিল্পপতি ও সিলেট-৬ আসনের দুই বারের প্রাক্তন সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন লেচু মিয়ার কন্যা সৈয়দা আদিবা হোসেন। আরেক নেত্রী সাবিনা খান পপি নিজের সাবলীল উপস্থাপনা দিয়ে সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের মন জয় করেছেন। তিনি যুক্তরাজ্য বিএনপি’র প্রাক্তন সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ে।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের একাংশ বলছেন, মনোনয়ন দৌড়ে থাকা চার চৌধুরীর মধ্য থেকেই একজনকে দলের প্রার্থী করা হতে পারে। তবে প্রচারে ভিন্নতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং দেশে থেকে স্থানীয়দের নানা প্রয়োজনে সাড়া দেওয়ার ধারাবাহিকতার কারণে আদিবাকে একেবারে গনণার বাইরে রাখতে নারাজ তারা। বিভিন্ন এলাকায় পৃথক জনসভায় নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সেই বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
স্থানীয় রাজনৈতিক সচেতনদের অনেকেই বলছেন, নারী ভোটারদের নৈকট্য অর্জনে সফল আদিবা। গোলাপগঞ্জ তার বাড়ি, এখানে ভোটার সংখ্যা বেশি। এই বিষয়টি ‘ভাইটাল’ হয়ে উঠতে পারে তার ক্ষেত্রে। তাছাড়া ধর্মভিত্তিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে নারী প্রার্থীর মনোনয়ন, ভোটের মাঠে চমক সৃষ্টি করে পাশার দান পাল্টে দিতে পারে বিএনপির জন্য।
দলের উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে থাকা চার চৌধুরীর মধ্যে তৃণমূলে জনপ্রিয় ফয়ছল আহমদ চৌধুরীকেই মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে রাখছে তৃণমূল। তারা বলছেন, ২০১৮ সালে কঠিন পরিস্থিতির মাঝেও নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেছিলেন তিনি। তৃণমূলে আলোচিত এই চার চৌধুরী প্রায় দুই মাস ধরে বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ উপজেলা সদরে একাধিক শো-ডাউন ও সভা সমাবেশ করে নিজেদের শক্ত অবস্থান দলের দায়িত্বশীলদের জানান দিয়ে যাচ্ছেন। তবে তৃণমূল দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন দুই নারী। একই সাথে গোলাপগঞ্জে উপজেলায় বাড়ি হওয়ায় এড. এমরান আহমদ চৌধুরীকে গনণা রাখছেন নেতাকর্মীরা। এমরান চৌধুরীও নিজের অবস্থান এরই মধ্যে জানান দিয়েছেন।
এরই মধ্যে ১৯ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সিলেট-৬ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। এরপর যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সামর্থ্য নিয়ে মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন তারা।
সিলেট জেলার দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, বিগত সময়ে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আনুগত্য থেকে মাঠে থাকা, ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতন ও হামলা-মামলার শিকার হওয়া এবং জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা রাখা নেতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। তবে নির্বাচনি এলাকার কৌশলগত দিক বিবেচনায় কেন্দ্র চমক দিতে ভিন্ন কিছুও ভাবতে পারে।
সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নজমুল হোসেন পুতুল বলেন, এ আসনে বিএনপি একবারই জয়লাভ করেছিল ১৯৭৯ সালে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনটি ৪৬ বছর পর বিএনপি কাছে ফিরে আসবে। সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ছরোয়ার হোসেন বলেন, গুলশানে মহাসচিবের সাথে সিলেট-০৬ আসনের ছয়প্রার্থী (চার চৌধুরীসহ দুই নারী প্রার্থী) বৈঠক করেছেন, এর বাইরে কেউ ছিলেন না। এখন দল যাকে মনোনয়ন দেবে প্রচারণায় থাকা সকল প্রার্থীসহ বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে কাজ করবেন। মহাসচিবের বৈঠকে সেই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক দৌলা হোসেন সুবাষ বলেন, মাঠের নেতৃত্ব এবার ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করতে কাজ করছে। নির্বাচনী প্রচারণা দলের অনেক প্রার্থী থাকলেও আমাদের ধারণা ঢাকায় যাদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে তাদের মধ্য থেকে একজনকেই বেছে নেয়া হবে। একক প্রার্থী থাকলে ৪৬ বছরের ধানের শীষের জয় খরা ঘুচবে।
বিয়ানীবাজার বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ছরোয়ার হোসেন বলেন, গুলশানে মহাসচিবের সঙ্গে সিলেট-৬ আসনের ৬ প্রার্থী বৈঠক করেছেন। এর বাইরে কেউ ছিলেন না। এখন দল যাকে মনোনয়ন দেবে সবাই তার পক্ষে কাজ করতে হবে।
মনোনয়নের ব্যাপারে সৈয়দা আদিবা সমকালকে বলেন, এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। প্রশ্নবিদ্ধ কাউকে সামনে রেখে বিজয়ের লক্ষ্যে লড়াই করা যাবে না। প্রতিপক্ষ অপ্রত্যাশীত রকম নিরব। সেক্ষেত্রে গায়ের জোরে না, তাদের পরিকল্পনা বুঝে নিয়ে মাথার জোরে লড়তে হবে। এবার বিএনপিকে জিততেই হবে। কারণ তারেক রহমানের ৩১ দফায় গণমানুষের মুক্তির মেন্ডেট রয়েছে। এর বাস্তবায়নে বিজয়ের বিকল্প ভাবার কোনো সুযোগ নেই।
বিএনপি নেতা ফয়সাল চৌধুরী বলেন, ‘এ দেশের আগামী কাণ্ডারি তারেক রহমানের ৩১ দফা বাস্তবায়নে নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করছি। মানুষের উৎসাহ উদ্দীপনা খুব কাছ থেকে দেখেছি।’ তিনি বলেন, কঠিন সময় কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে লড়াই করেছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, করোনাসহ নানা সময়ে মানুষের পাশে দাড়িয়েছি। ২০১৮ নির্বাচনে প্রতিকুল পরিস্থিতে নিজের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ রেখে ভোট এনেছি ধানের শীষে। সুযোগ পেলে এবার দলের বিজয় নিশ্চিত করব।

