Collected from: somoynews.tv
দুর্ঘটনাপ্রবণ ও নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা শুধু সড়ক নিরাপত্তার জন্য নয়, শিশু, গর্ভবতী নারী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও নীরব হুমকি হয়ে উঠছে। এসব যানবাহনে ব্যবহৃত ব্যাটারি এখন দেশের অন্যতম বড় সিসা দূষণের উৎসে পরিণত হয়েছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই নীরব ঘাতক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও মেধার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
শহর থেকে গ্রাম; সবখানেই এখন ছুটে চলেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করে। প্রতিটি রিকশায় থাকে চারটি করে ব্যাটারি। এসব যানের পুরোনো ব্যাটারির বড় অংশ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয় অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত কারখানায়। সেখানে খোলা পরিবেশে ব্যাটারি ভেঙে সিসা সংগ্রহ করা হয়, যা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের মাটি, পানি ও বাতাসে।
ব্যবহার শেষে সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহৃত ব্যাটারির পরিমাণও বাড়ছে। প্রতিটি অটোরিকশায় গড়ে চারটি সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি থাকে। এসব ব্যাটারির আয়ুষ্কাল সাধারণত নয় মাস থেকে এক বছর। এরপর সেগুলো পরিবর্তন করতে হয়। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ব্যবহৃত ব্যাটারি জমা হচ্ছে, যেগুলোর বড় অংশ অনিরাপদভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। এতে ভয়াবহ মাত্রায় বাড়ছে সিসা দূষণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহৃত ব্যাটারির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ উপায়ে রিসাইক্লিং করা হয়। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এতে শেখার ক্ষমতা ও আইকিউ কমে যায়।
পিওর আর্থের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাস বলেন, শিশুরা বড়দের তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি সিসা শোষণ করে। ফলে তাদের মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এর কারণে আইকিউ কমে যায় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের নামে যত্রতত্র কারখানা গড়ে উঠছে। এর ফলে মাটি দূষিত হচ্ছে। সেই দূষিত মাটিতে খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে, প্রাণীকুলও দূষণের শিকার হচ্ছে।
আইসিডিডিআরবির গবেষক ড. মাহাবুবুর রহমান বলেন, সিসা মাটি, মানুষ, প্রাণী ও কৃষিপণ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ পরিবেশের প্রায় সব ক্ষেত্রই দূষিত হচ্ছে। তাই দূষণের উৎস বন্ধ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
অবৈধ ব্যাটারি কারখানা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানান পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক। তিনি বলেন, যারা অনিয়মিতভাবে যত্রতত্র ব্যাটারি গলাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরিবেশ অধিদফতর, ভোক্তা অধিকার অধিদফতর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে কাজ করছে, যাতে সিসা উৎপাদন বা ব্যবহারের ঝুঁকিপূর্ণ উৎসগুলো বন্ধ করা যায়।
ব্যাটারিচালিত রিকশায় ব্যবহৃত ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা নতুন ধরনের বিপদ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া ব্যাটারিচালিত যানবাহনের এই ক্রমবর্ধমান সংকট ভবিষ্যতে আরও বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। তাই এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে সিসা দূষণের এই নীরব সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে একটি মেধাহীন প্রজন্ম তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।