Collected from: somoynews.tv
আলো ঝলমলে ঢাকা। প্রযুক্তির উৎকর্ষে বদলে যাচ্ছে নগরী। কিন্তু বদলাচ্ছে না গণপরিবহনের জরাজীর্ণ রূপ। ফিটনেসবিহীন বাসের দৌরাত্ম্যের মধ্যেই অবৈধ ওয়ার্কশপে তৈরি হচ্ছে দুর্বল কাঠামো। ঈদ সামনে রেখে দ্বিগুণ বেগে চলছে এমন কর্মযজ্ঞ। অবসরের অজুহাতে এসব বিষয়ে কথা বলতে নারাজ বিআরটিএ চেয়ারম্যান। আর ট্রাফিক পুলিশ দিচ্ছে- লোকবল সংকট আর ডাম্পিং স্টেশন না থাকার দোহাই। রাজধানীর বেহাল গণপরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব আজ।
রাজধানীর রাজপথ, এলোমেলো ছুটছে নানা ধরনের গাড়ি। এ যেন কোনো দুর্ঘটনার আগের নীরব ট্রেলার, যা ধরা পড়ে সময় সংবাদের ক্যামেরায়। শহরের প্রতিটি সড়কে দেখা যায় তালি মারা বডি, ভাঙা গ্লাস, ঝুলে থাকা দরজা আর কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে গর্জন তুলে ছুটে চলছে বাস। যাত্রীবোঝাই এসব বাস আসলেই কি নিরাপদ বাহন নাকি চলমান কফিন, সে প্রশ্ন যেকোনো সচেতন মনে উঁকি দেয়!
ছেঁড়া সিট, ফ্লোরে গর্ত, মরিচা ধরা লোহার ফ্রেম এমন পরিবহনেই প্রতিদিন হাজারও মানুষ জীবন হাতে নিয়ে গন্তব্যে যাতায়াত করছে। ব্রেক কবে ফেল করবে, চাকা কবে খুলে যাবে, কোনো কিছুরই নেই নিশ্চয়তা। অথচ ঝুঁকি নিয়েও বিকল্প না থাকায় চলতে হচ্ছে এসব বাসে।
যাত্রীরা বলছেন, ঢাকায় ও ঢাকা থেকে আশপাশের জেলায় চলাচল করা ৮০ শতাংশ গাড়ি ভাঙাচোরা। চাইলেও এসব যানবাহনে উঠা বন্ধ করা যায় না।
এমন ফিটনেসবিহীন বাস নিয়ে দাপিয়ে বেড়ানো চালকদের আবার অজুহাতের শেষ নেই।
চালকরা বলছেন, এক গাড়ির সঙ্গে আরেক গাড়ি লেগে বাসের নানান জিনিস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মালিক আগের মতন টাকা পায় না, তাই ঠিক করাতে পারে না।
আনফিট বাসের পেছনের গল্প আরও ভয়ংকর। সেই উত্তর খুঁজতে যাত্রাবাড়ির কাজলা এলাকায় সময় সংবাদ। অপরাধের সূত্র শুধু সড়কে নয়— অবৈধভাবে গড়ে উঠা অসংখ্য ওয়ার্কশপেও।
রাজধানীর উপকণ্ঠের ওয়ার্কশপগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, অদক্ষ কারিগরদের হাতেই তৈরি হচ্ছে বাসের বডি। সারা বছর চলা এ কর্মযজ্ঞ ঈদকে সামনে রেখে আরও জোরালো হয়ে উঠে। দূরপাল্লার যাত্রার জন্য তৈরি করা হচ্ছে এ বাসগুলো।
এসব বিষয়ে জানতে বিআরটিএ ভবনে সময় সংবাদ। দায়িত্বগ্রহণের প্রায় এক বছরে গণপরিবহনের বেহাল দশা নিরসনে চেয়ারম্যান আবু মমতাজের ভূমিকা জানতে চাইলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় রেখে অবসরে যাওয়ার অজুহাতে কথা বলতে নারাজ আবু মমতাজ। পরে সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তার দুয়ারে কড়া নাড়লেও গণমাধ্যম এড়িয়ে যান প্রত্যেকেই।
তবে ডিএমপি ট্রাফিকের অতিরিক্ত কমিশনার জানান, ফিটনেসবিহীন পরিবহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। কিন্তু সমাধানে বড় বাধা লোকবল সংকট ও ডাম্পিং স্টেশনের অভাব।
ডিএমপি ট্রাফিকের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘আমাদের মামলার পরিমাণ অনেক। আমরা রেগুলার মামলা করি। কিন্তু আটকের বিষয়ে যে কথা বলা হচ্ছে, সে সুযোগ আমাদের খুব একটা নেই। কারণ আমাদের তো ডাম্পিং স্টেশন নেই। ফলে আমি চাইলে একসঙ্গে ২০টি বাস আটক করে কোথাও রাখতে পারি না।’
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ এসব ওয়ার্কশপ আর ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে কঠোর না হলে কোনোভাবেই বন্ধ হবে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল।
পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘যেসব বাস তৈরি হচ্ছে, এর কোনোটাই বিজ্ঞান সম্মত না। আমার মনে হয় লোক দেখানো কিছু না করে, পুলিশ ও বিআরটিএ থেকে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এর লাগাম টানা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার ৪২টি রুটে ৫-৬টি কোম্পানির আওতায় যদি বাস পরিচালনা করা যায় তাহলে এটা সহজ হবে। সরকার যদি এক্ষেত্রে ইনভেস্ট করে তাহলে এখানে লন্ডনের মতো যাত্রী সুবিধা বিবেচনায় উন্নত পরিবহন সার্ভিস দেয়া সম্ভব।’
সড়ক পরিবহন আইন কাগজে কঠোর হলেও প্রয়োগে আছে ফাঁকফোকর। প্রশ্ন উঠছে…এটা কি কেবল অবহেলা, নাকি উদাসীনতা? যাত্রীদের জীবনের দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে?

